‘আমাকে টানাহেঁচড়ার মধ্যে রাখা হচ্ছে, এতে দেশের মানুষ ঠকছে’

‘আমি তো আমার কাজ নিয়ে মশগুল ছিলাম। কেউ আমার ওপর রাগ করল। কেন রাগ করল? এত রাগ করল যে, আমাকে কাজকর্ম থেকে বিচ্যুত করে দিতে হবে?’
স্টার ফাইল ফটো

ঢাকার শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল থেকে বেরিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এই বয়সে এসে মনে হলো এবার শান্তি নিয়ে বাকি কাজগুলো করে ফেলি। এতদিন ধরে যা করে এসেছিলাম তার একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে চেয়েছিলাম। সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার আর সুযোগ পাচ্ছি না।

তিনি বলেন, 'আমাদের কাজ করতে না পারার কারণে মানুষ যে বঞ্চিত হলো, কাজগুলো যে করতে পারলাম না, সেটার জন্য কষ্ট লাগে। আমরা যে কাজ করি, সেটাতে পৃথিবীর মানুষ আগ্রহী। তারা জানতে চায়। তারা এটা গ্রহণ করে। আমরা তো আর এমন না যে বিরাট কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে বিদেশে যাব।'

ড. ইউনূস বলেন, 'আমরা শুধু পরামর্শ দিচ্ছি। মানুষকে অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করি কাজ করার জন্য। আমার কাছে ভালো লাগে। এই অনুপ্রেরণায় অনেক মানুষ সাড়া দেয়। সাধারণ মানুষ সাড়া দেয়, তরুণরা সাড়া দিচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা সাড়া দেয়, ছোট ব্যবসায়ী সাড়া দেয়, দুনিয়ার বড় বড় ঝানু ব্যবসায়ী, বহু ধনী ব্যক্তি— তারাও সাড়া দেয়।'

'আমাদের তো কোনো ক্ষমতা নেই তাদের বাধ্য করার। তারা নিজেরাই সাড়া দেয়। তারা নিজেরাই এগিয়ে আসে। এটাই ভালো লাগে এবং ভালো লাগে যে এটা বাংলাদেশ থেকে আসা একটা আইডিয়া, একটা কনসেপ্ট, এত কর্মকাণ্ড পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় অতি আগ্রহের সঙ্গে সেটা দেখেছে', বলেন তিনি

ড. ইউনূস বলেন, 'দেশের মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস জাগে যে, আমরা একটা ফেলনা জাতি না। আমরা এমন একটা জাতি, যে দুনিয়ার সামনে একটা নমুনা নিয়ে আসতে পেরেছে, যা মানুষের কাজে লাগে, মানুষ সেটা গ্রহণ করে। কিছু কিছু জিনিস আমার কাছে অদ্ভুত লাগে। কোনোদিন চিন্তা করিনি যে এরকম একটা কাজের সঙ্গে জড়িত হতে পারব।'

'যেমন প্যারিস অলিম্পিক আগামী জুলাই মাসে হবে। এই যে কথাগুলো বলেছি, তাদের মনে গেঁথেছে। পুরো প্যারিস অলিম্পিকের ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে আমি যেসব কথা বলেছি, তার আঙ্গিকে। কাজেই এটাও তো একটা গর্ব করার মতো জিনিস। আমার ব্যক্তিগত গর্বের কথা ছেড়ে দিলাম। এটা বড়াই করার বিষয় না। কিন্তু কথা হলো যে, বাংলাদেশের একটা আইডিয়া প্যারিসের মতো জায়গায়, এত জ্ঞানীগুণীর যে শহর যে দেশ, তারা আমার ধারণাকে নিয়ে একটা অলিম্পিক তৈরি করতে যাচ্ছে। তারা এটা কীভাবে করবে, এটাকে স্বীকৃতি দেবে কি দেবে না, সেটা তাদের বিষয়', বলেন তিনি।

ড. ইউনূস বলেন, 'আমার কাছে আনন্দের বিষয়, তরুণরা উদ্বুদ্ধ হয় যে আমাদের ধারণা দিয়ে একটা মহা কর্মকাণ্ড হতে যাচ্ছে। এটাও মনে রাখার বিষয়, প্যারিসে যে অলিম্পিকটা হচ্ছে, সেটা ১০০ বছর পর প্যারিসে হচ্ছে। তাদের উৎসবের সীমা নেই, যে ১০০ বছর পর অলিম্পিক আমাদের কাছে ফিরে এসেছে। সেই ১০০ বছর পর ফিরে আসা অলিম্পিকের ধারণাগত, কাঠামোগত জিনিসটা আসছে বাংলাদেশ থেকে। এটা তো মহা-সম্মানের ব্যাপার। আগামীতে কীভাবে হবে, আপনারা তা দেখবেন।'

তিনি বলেন, 'আমাকে স্পোর্টস জগতের মধ্যে আস্তে আস্তে টেনে নিচ্ছে। আমি স্পোর্টসের মানুষ না। কোনোদিনই ছিলাম না। স্পোর্টসে কোনো কাজ করিনি। কিন্তু এখন আমাকে স্পোর্টসের ব্যাপারে জানতে হয়। আপনারা টোকিও অলিম্পিকে খেয়াল করেছেন। সেখানে আমাকে অলিম্পিক জগতের, স্পোর্টস জগতের সবচেয়ে বড় যে সম্মাননা– অলিম্পিক লরেল দেওয়া হয়েছে। সারা দুনিয়ার মানুষ, কোটি কোটি মানুষ সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখেছে। তারা আমাকে সম্মান দিচ্ছে। সে সম্মান আমি গ্রহণ করেছি।'

'এর ফলে এই জগতের সঙ্গে আমার আরেকটা পরিচয় হয়ে গেল এবং অলিম্পিক লরেল এখন পর্যন্ত মাত্র দুইবার দেওয়া হয়েছে। আমাকে দেওয়া হয়েছে আর প্রথম আরেকজনকে দেওয়া হয়েছে। আর দেওয়া হয়নি', যোগ করেন তিনি।

ড. ইউনূস বলেন, 'ভবিষ্যতে এই সম্মাননা কীভাবে দেওয়া হবে, সেটার জন্য একটা সিলেকশন কমিটি তৈরি হয়েছে। আমি অবাক হলাম যে, আমাকে সেই সিলেকশন কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এটাও একটা মহা-সম্মান। আমি ও আমরা সেই কমিটিতে বসে ঠিক করব যে পৃথিবীর সবচাইতে বড় সম্মাননা স্পোর্টস জগতের, সেটা কে পাবে। এটা আমার একার সম্মান না। এটা দেশের সম্মান। দেশের কথা উল্লেখ করতেই হবে যে বাংলাদেশের সন্তান এখানে এসেছে।'

তিনি বলেন, 'আমি ফুটবলের সঙ্গে, ফুটবল জগতের সঙ্গে পরিচিত মানুষ না। আমি ফুটবলের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। এখন ফিফার অনুষ্ঠানে আমাকে প্রধান অতিথি করে নিয়ে যাওয়া হয়। যেহেতু আমি এমন কোনো কথাবার্তা বলেছি যেগুলো স্পোর্টস জগতের মধ্যে ঢুকতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু আমি তো তাদের বাধ্য করতে পারছি না। তারাই আমাকে স্বাগত জানাচ্ছে, আমাকে নিয়ে যাচ্ছে এবং এখন ক্রীড়া জগতের বিভিন্ন জায়গাতে সেটা প্রতিফলিত হচ্ছে।'

'এই যে একটু আগে আমরা অপেক্ষা করছিলাম এখানে আসার জন্য, সেখানে হঠাৎ এক বিদেশি ভদ্রলোক এসে আমার সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী। জানালেন "আমি বাংলাদেশের সঙ্গেও ব্যবসা করি। আমি বহু টাকা অর্জন করেছি। কিন্তু কিছু টাকা আমি পৃথকভাবে রেখে দেই সবসময়। এটাকে আমার টাকা মনে করি না। এতে বেশ বড় পরিমাণ টাকা জমা হয়েছে। আমি অপেক্ষা করছি আপনার সঙ্গে আলাপ করব এই টাকা দিয়ে কী করা যায়, সেটা জানার জন্য। আপনার সামাজিক ব্যবসার কথা আমি শুনেছি, পড়েছি। এটা কীভাবে আপনার সামাজিক ব্যবসায় খাটাতে পারি।" এই লোককে তো আমি চিনি না। এই লোকের এতো টাকা। সে এটা খরচ করতে চায়, কীভাবে করবে, সে পরামর্শের জন্য আমার কাছে এসেছে। আমার অফিসে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু সে বলেছে, না এখানেই একটু দেখা করেছি, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। পরে আপনি সময় দিলে আবার আপনার সঙ্গে এসে দেখা করব', বলেন তিনি।

ড. ইউনূস বলেন, 'এই যে মানুষকে, তরুণকে, ব্যবসায়ীকে উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারটা, এটার নতুন কতগুলো কাঠামো, যেখানে আমরা বলছি তিন-শূন্যের পৃথিবী সৃষ্টি করব। মানুষ এক কথায় উড়িয়ে দিতে পারত, কিন্তু তা উড়িয়ে না দিয়ে সে গ্রহণ করছে, সেগুলো কাজে লাগাচ্ছে। এই যে কাজ করার একটা উঁচু লেভেলে আমরা আসতে পেরেছি এবং প্রচুর কাজ করতে পারতাম, যদি না আমরা এইসব টানাহেঁচড়ার মধ্যে পড়ে না যেতাম, দুর্যোগের মধ্যে না পড়তাম। এতে ঠকছে কারা? আমি কি ঠকছি? আমার ঠকার কী আছে? আমি যা করার করেছি। শেষ বয়সে এসে যা করে যেতে চেয়েছিলাম আমাকে সে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। আমাকে নানা টানাহেঁচড়ার মধ্যে রাখা হচ্ছে। এতে দেশের মানুষ ঠকছে।'

'আরেকটা নতুন কিছু করতে পারলে দেশের মানুষ উল্লেখ করত, এটা বাংলাদেশ থেকে আমরা শিখেছি। এই সুযোগটা হলো না। এটাই হলো দুঃখের বিষয়। দুর্যোগ থেকে যেন আমরা মুক্তি পেতে পারি, সেজন্য আপনারা দোয়া করেন। আমি দেশবাসীর কাছ থেকে সেই দোয়াটা চাচ্ছি', বলেন তিনি।  

সেসময় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন- আপনি বললেন আপনি দুর্যোগের মধ্যে আছেন, আপনাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে। এই দুর্যোগটা সৃষ্টি করল কে?

তখন ড. ইউনূস বলেন, 'আপনিই বলেন। আপনি তো দেখেছেন। কী জন্য আমি এখানে আসলাম। কে আমাকে এখানে আনল। মুখ খুলে বলেন যে, কারা আমাকে এখানে কেন আনিয়েছে।'

'আপনি যে আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলেন, আমিও একরকম আগ্রহ নিয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করছি। আমি তো উত্তর জানি না। আমি তো আমার কাজ নিয়ে মশগুল ছিলাম। কেউ আমার ওপর রাগ করল। কেন রাগ করল? এত রাগ করল যে, আমাকে কাজকর্ম থেকে বিচ্যুত করে দিতে হবে? আমাকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরিয়ে দিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কী সেই রাগের কারণ, সেটা আপনারা বিশ্লেষণ করুন। আমার কাছে তো অচিন্তনীয় ব্যাপার মনে হয়।'

সাংবাদিকরা জানতে চান- আপনাকে যে প্রতিনিয়ত এরকম আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে, তাতে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ইমেজ সংকট হচ্ছে কি না?

ড. ইউনূস বলেন, 'অবশ্যই হচ্ছে। মানুষ দেখছে, যে লোকের সঙ্গে সে দেখা করার জন্য বসে আছে, সে লোক আদালতে হাজিরা দিয়ে বেড়াচ্ছে। অফিসে আসতে পারছে না।'

সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, আপনি কি কারও রাজনৈতিক ক্ষতি করেছেন বা ক্ষতি করার চেষ্টা করেছেন?

ড. ইউনূস বলেন, 'আমার জ্ঞানত তো করিনি। আপনারা কি মনে করেন আমি করেছি? বলেন? আমাকে দেখিয়ে দেন এভাবে আপনি ক্ষতি করেছেন।'   

তখন সাংবাদিকরা জানতে চান- কেউ কি চিন্তা করেছে যে আপনি ক্ষতি করতে পারেন?

ড. ইউনূস সেসময় বলেন, 'তার মাথার ভেতর ঢোকার তো কোনো ক্ষমতা আমার নেই।'

 

Comments

The Daily Star  | English

An economic corridor that quietly fuels growth

At the turn of the millennium, travelling by road between Sylhet and Dhaka felt akin to a trek across rugged terrain. One would have to awkwardly traverse bumps along narrow and winding paths for upwards of 10 hours to make the trip either way.

8h ago