আওয়ামী লীগ ইস্যুতে সরকারে সমন্বয়হীনতা?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে সোচ্চার অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা পক্ষটি। যদিও তাদের অংশীজনদের সবাই এই দাবির সঙ্গে একমত নয়।

এই ইস্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার যে অবস্থান, তার সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন দুজন উপদেষ্টাও।

মার্চের শুরুতে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত তারা নেবে।

এরপর গত ২০ মার্চ ঢাকায় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ড. কমফোর্ট ইরোর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনায় ড. ইউনূস বলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা তার সরকারের নেই। তবে দলটির যেসব নেতার বিরুদ্ধে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বাংলাদেশের আদালতে বিচার করা হবে।

এর ঠিক পরদিনই তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে লিখেছেন, 'আওয়ামী লীগ কোনো দেশীয় শক্তি নয়। এটা মূলত বিদেশ থেকে ট্রান্সপ্লান্টেড একটি শক্তি। এটার নাটাই ধরে রাখা হয়েছে দিল্লিতে। ঘুড়ি উড়ে বাংলাদেশে। এই ঘুড়ি আর বাংলাদেশে উড়তে দেওয়া হবে না।'

একই দিন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদও একই ভাষায় ফেসবুকে লিখেছেন, 'আওয়ামী ঘুড়ি বাংলাদেশে উড়তে দেওয়া হবে না। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সকল শক্তিকে এ বিষয়ে এক হতে হবে।'

তাদের দুজনের বক্তব্যে ঘুড়ি শব্দটি কমন। তারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ হচ্ছে একটি ঘুড়ি, যার নাটাই দিল্লিতে।

মাহফুজ আলম মেধাবী হিসেবে পরিচিত। নানা বিষয়ে তার ব্যাপক পড়াশোনা আছে বলে মনে করা হয়। সুতরাং আওয়ামী লীগের জন্ম ও বিকাশের ইতিহাসটি তার না জানার কথা নয়।

যে আওয়ামী লীগ পঞ্চাশের দশক থেকে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং যে দলের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই দলটিকে তিনি কী করে 'বিদেশ থেকে ট্রান্সপ্লান্টেড শক্তি' বলে অভিহিত করলেন, সেটি বিস্ময়ের। তিনি যদি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগের কথা বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি তার লেখায় স্পষ্ট করা উচিত ছিল। তাছাড়া শেখ হাসিনার শাসনামলের অনিয়ম-দুর্নীতি-দলীয়করণ এবং রাষ্ট্রকে 'পরিবার লিমিটেড কোম্পানি' হিসেবে গড়ে তোলার সমালোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনার অর্থ এই নয় যে, আওয়ামী লীগকে বিদেশি শক্তি বলতে হবে বা শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাদের দুর্নীতির কারণে দলটিকে নিষিদ্ধ করতে হবে।

১৯৭১ সালে যে দলটি ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার সহযোগী ছিল, সেই দলটি দেশে দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করবে; ক্ষমতা কাঠামোর অংশ হবে; আর যে দলটির নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সেই দলকে নিষিদ্ধ করা হবে—এই দাবিটি অবশ্য ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়।

মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ইস্যুতে জুলাই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থানও ভিন্ন। আওয়ামী লীগ বিগত ১৫ বছর ধরে বিএনপিকে মাইনাস করার চেষ্টা করলেও বিএনপি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা বা নির্মূল করার ধারণার সঙ্গে একমত নয়। কিন্তু এই ইস্যুতে সরকারের একটি অংশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান অংশীজন তরুণদের দল এনসিপি ও জামায়াতের অবস্থান অভিন্ন। কেন এই ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতসহ অন্যান্য দলের অবস্থান ভিন্ন, সেটি অন্য তর্ক।

সরকার প্রধানকে খারিজ করা হলো?

মাহফুজ আলম এবং আসিফ মাহমুদ যা লিখেছেন, সেটি তাদের অ্যাক্টিভিজমের অংশ। সরকারে থেকে অ্যাক্টিভিজম করা যায় কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। কেননা সরকার হচ্ছে জনগণের। ফলে রাষ্ট্রীয় চেয়ারে বসে এমন কোনো কথা বলা যায় না, যাতে মনে হয় যে তারা ব্যক্তিগত ও দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।

বিগত দিনে যারা সরকারে ছিলেন, তারা এই ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন, তা নয়। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন ধরনের সরকারটি গঠিত হলো এবং যারা সত্যিই একটি নতুন ধরনের রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের দিকে হাঁটবেন বলে অনেকের মনে বিশ্বাস জন্মেছিল। কাজেই তারা এটা বিবেচনা করবেন সেটাই কাম্য। কিন্তু, সরকারের উপদেষ্টাদের যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে কথা বলা প্রয়োজন ছিল—সেখানে দারুণ শূন্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, যখন সরকার প্রধান কোনো একটি কথা বলেন বা সিদ্ধান্ত দেন, তার উপদেষ্টা পরিষদের অন্য কেউ ঠিক তার বিপরীতে গিয়ে অবস্থান নিলে সেখানে কয়েকটি প্রশ্নের জন্ম হয়—

১. যারা বিপরীত অবস্থান নিলেন তারা কি সরকার প্রধানকে গুরুত্ব দিলেন না?

২. সরকার প্রধান কোনো একটি বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার পরদিনই যদি তার মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদের একাধিক সদস্য তার বিরোধিতা করেন, পাল্টা অবস্থান নেন, তখন সেটি কি সরকার প্রধানের দিকে একধরনের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া নয়?

৩. সরকার প্রধানকে গুরুত্ব না দিয়ে বা তাকে খারিজ করে দিলে কি তাদের উপদেষ্টা পরিষদে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে?

রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির নতুন অভিজ্ঞতা

অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান যা বলেন, তার বিপরীতে বা বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো মন্ত্রী-এমপি, এমনকি দলের শীর্ষ নেতারা টুঁ শব্দটিও করেন না। বরং প্রধানমন্ত্রী যদি ভুল বা অন্যায় কিছু বলেন, তারা সেটিরও সমর্থন দিয়েছেন নিঃশর্তভাবে। উপরন্তু তার ভুলটিকেও সঠিক প্রমাণের জন্য অব্যাহতভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, যুক্তি দিয়েছেন।

এমন চাটুকারিতার 'সংস্কৃতির' বৃত্তে বন্দি আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদের ফেসবুক পোস্ট অবশ্য এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে যে, সরকারে থেকেও সরকারপ্রধানের সমালোচনা করা যায়। এটা একধরনের স্পর্ধা। একধরনের 'ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স'। কিন্তু ব্যাপারটা আসলেই এরকম কি না—সেটি নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পরে ড. ইউনূস একাধিকবার বলেছেন, ছাত্ররাই তার প্রাথমিক নিয়োগকর্তা এবং ছাত্ররা যখন চাইবে তিনি চলে যাবেন। তার এই বক্তব্যের সমালোচনাও হয়েছে যে, সরকার প্রধান হিসেবে তিনি শুধু একটি অংশের প্রতিনিধি নন। তিনি সব দলের, সব মানুষের। সুতরাং ছাত্রদের অনুরোধে তিনি এসেছেন এবং তারা চাইলেই তিনি চলে যাবেন—এই কথার মধ্য দিয়ে তার অসহায়ত্ব বা ছাত্রদের ওপর অতি নির্ভরশীলতা প্রকাশিত হয়েছে। তার ফলেই আওয়ামী লীগ ইস্যুতে সরকারের মধ্যে এই সমন্বয়হীনতা কি না—সে প্রশ্নও উঠছে।

ভিন্নমত প্রকাশ ফেসবুকে কেন?

এটা ঠিক, সরকার প্রধান যা বলবেন বা যা করতে চাইবেন, তার সবকিছু সঠিক নাও হতে পারে। তার সঙ্গে দ্বিমত ও ভিন্নমত পোষণের অধিকার তার সহকর্মীদের রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ভিন্নমত তারা কীভাবে প্রকাশ করবেন? ফেসবুক কি একজন মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টার ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা? একজন অ্যাক্টিভিস্ট বা সাধারণ নাগরিক, এমনকি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো একটি বিষয়ে তার রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু একজন মন্ত্রী বা সরকারের উপদেষ্টা কি সেটি পারেন? পারেন না। এটি শোভন নয়।

কোনো বিষয়ে সরকার প্রধানের সঙ্গে দ্বিমত হলে কেবিনেটে আলোচনা হতে পারে; সেখানে তর্ক-বিতর্কের ঝড় উঠতে পারে; যুক্তি দিয়ে সরকার প্রধানকে তার অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য করা যেতে পারে। কিন্তু, সরকার প্রধান কোনো একটি বিষয়ে যা বললেন, তার সহকর্মীরা ঠিক বিপরীত অবস্থান নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যায় যে, সরকারের ভেতরেই সমন্বয় নেই।

সরকারের ভেতরে সমন্বয় না থাকলে বিরোধীরা এর সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে ড. ইউনূসের উচিত হবে, যেকোনো বিষয়ে সরকারের ভেতরের সমন্বয়হীনতা দূর করা এবং মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদরা যদি মনে করেন যে তারা অ্যাক্টিভিজম করবেন, তাহলে তাদের উচিত হবে সরকার থেকে বেরিয়ে দলে যোগ দেওয়া। তাদের সতীর্থরা যে দলটি গঠন করেছেন, সেখানে তাদের উপস্থিতি দলকে নিশ্চয়ই আরও শক্তিশালী করবে।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

Comments

The Daily Star  | English

Yunus meets Chinese ambassador to review China visit, outline next steps

Both sides expressed a shared commitment to transforming discussions into actionable projects across a range of sectors

8h ago